1. adnanfahim069@gmail.com : Adnan Fahim : Adnan Fahim
  2. admin@banglarkota.com : banglarkota.com :
  3. kobitasongkolon178@gmail.com : Liton S.p : Liton S.p
  4. miraz55577@gmail.com : মোঃ মিরাজ হোসেন : মোঃ মিরাজ হোসেন
  5. ridoyahmednews@gmail.com : Ridoy Khan : Ridoy Khan
  6. irsajib098@gmail.com : Md sojib Hossain : Md sojib Hossain
  7. zahiruddin554@gmail.com : Md. Zahir Uddin : Md. Zahir Uddin
শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ০৭:৪২ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :

আপনার লেখা গল্প,কবিতা,উপন্যাস, ছড়া গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করতে যোগাযোগ করুন। সাগরিকা প্রকাশনী ০১৭৩১৫৬৪১৬৪৷ কিছু সহজ শর্তে আমরা আপনার পান্ডুলিপি প্রকাশের দায়িত্ব নিচ্ছি।

জাতির পিতার শিক্ষা ভাবনা ও এসডিজি -৪ লেখকঃ মোহাম্মদ ফখরুল হাসান।বাংলার কথা অনলাইন।

প্রতিবেদকের নাম:
  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ, ২০২১
  • ৪১০ বার পড়া হয়েছে

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখানো ইতিহাসের এক মহানায়ক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি। চিন্তা-চেতনায় তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে শতবর্ষ অগ্রগামী। যুগ যুগ ধরে তাঁর দর্শন এই বাঙ্গালি তথা সারা বিশ্বের চিন্তাবিদদের অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে। সময়ের পরিক্রমায় শোষিত, বঞ্চিত এই বাঙ্গালি জাতির মনে যে স্বাধীনতার স্বপ্ন লালিত ছিল তার চূড়ান্ত বিজয় এসেছিল এই মহানায়কের হাত ধরে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে চূড়ান্তভাবে উচ্চারিত ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ যা নয়মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ ও লক্ষ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের দামে বাঙ্গালির ঘরে উঠেছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর । মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর ধ্বংসলীলায় ক্ষত-বিক্ষত ছিল আমাদের অর্থনীতি সেই সাথে জাতিকে চূড়ান্তভাবে শতবছর পিছিয়ে রাখার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতে এদের দোসর রাজাকার-আলবদরদের সহায়তায় জন্ম দেয়া হয়েছিল ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস; হারাতে হয়েছিল জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। এমনি এক ভঙ্গুর অবস্থায় বঙ্গবন্ধু দেশ গড়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পরেন। সকলকে ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে একটি সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে নিতে থাকেন একের পর এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন শিক্ষায় উন্নতি না হলে দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। কাজেই নব্য স্বাধীন দেশের জন্য একটি যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা উপহার দেয়ার জন্য ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই দেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে গঠন করেন স্বাধীন দেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন। উদ্দেশ্য একটাই জাতিকে একটি আলোর পথের সন্ধান দেয়া যা এদেশের মানুষকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে সোনার বাংলা গড়ার জন্য সোনার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।
২০১৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে ১৯৩টি দেশের উপস্থিতিতে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট “এজেন্ডা-২০৩০” গৃহীত হয়। সকলের অংশীদারিত্বে বিশ্বের সকল মানুষের জন্য সমৃদ্ধ ও শান্তিময় পৃথিবী গড়ে তোলাই হলো টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ ও জলবায়ু সুরক্ষা রেখে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গঠন করার জন্য ১৭টি অভিষ্ট নির্ধারিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে উক্ত এজেন্ডা গ্রহণ করেন। “এজেন্ডা-২০৩০” কে সামনে রেখে ১৬৯ টি লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়; সেই সাথে অগ্রগতি মনিটরিং এর জন্য ২৩১টি স্বতন্ত্র সূচক নির্ধারণ করা হয়। বিশ্বের অপরাপর রাষ্ট্রের ন্যায় বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্য এসডিজি অর্জনের প্রত্যয়কে আরো অনুপ্রাণিত করছে ।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট
১ সর্বত্র সব ধরনের দারিদ্র্যের অবসান
২ ক্ষুধার অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান অর্জন ও টেকসই কৃষির প্রসার
৩ সকল বয়সী সকল মানুষের জন্য সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণ
৪ সকলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি
৫ জেন্ডার সমতা অর্জন এবং সকল নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন
৬ সকলের জন্য পানি ও স্যানিটেশনের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা
৭ সকলের জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি সহজলভ্য করা
৮ সকলের জন্য পূর্ণাঙ্গ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং শোভন কর্মসুযোগ সৃষ্টি এবং স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন
৯ অভিঘাতসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই শিল্পায়নের প্রবর্ধন এবং উদ্ভাবনার প্রসারণ

১০ অন্তঃ ও আন্তঃদেশীয় অসমতা কমিয়ে আনা ১১ অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, অভিঘাতসহনশীল এবং টেকসই নগর ও জনবসতি গড়ে তোলা ১২ পরিমিত ভোগ ও টেকসই উৎপাদনধরন নিশ্চিত করা ১৩ জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবেলায় জরুরি কর্মব্যবস্থা গ্রহণ ১৪ টেকসই উন্নয়নের জন্য সাগর, মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার ১৫ স্থলজ বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষা প্রদান এবং টেকসই ব্যবহারে পৃষ্ঠপোষণা, টেকসই বন ব্যবস্থাপনা, মরুকরণ প্রক্রিয়ার মোকাবেলা, ভূমির অবক্ষয় রোধ ও ভূমি সৃষ্টি প্রক্রিয়ার পুনরুজ্জীবন এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাস প্রতিরোধ ১৬ টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থার প্রচলন, সকলের জন্য ন্যায় বিচার প্রাপ্তির পথ সুগম করা এবং সকল স্তরে কার্যকর, জবাবদিহিতাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ ১৭ টেকসই উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব উজ্জীবিতকরণ ও বাস্তবায়নের উপায়সমূহ শক্তিশালী করা

“কাউকে পশ্চাতে রেখে নয়” টেকসই উন্নয়নের এই মূলমন্ত্র মনে করিয়ে দেয় জাতির পিতার হাতে প্রণীত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের সুযোগের সমতা সংশ্লিষ্ট ধারা ১৯ যেখানে সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত আছে

“(১) সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন ৷

(২) মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য, নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ সুবিধা দান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।”

জাতির পিতার স্বপ্ন, বাংলাদেশের সংবিধানের এই ধারা ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের মূলমন্ত্র সবই যেন এক সুতোয় গাঁথা।

শিক্ষাকে বলা হয় টেকসই উন্নয়ন অভিষ্টের অন্যতম হাতিয়ার। একমাত্র শিক্ষাই পারে উন্নয়নকে টেকসই রূপ প্রদান করতে। কাজেই গুণগত শিক্ষার লক্ষ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের অন্যতম অভীষ্ট হিসেবে গৃহীত হয়েছে এসডিজি-৪। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-৪ এ ১০ টি লক্ষ্যমাত্রা (৪.১, ৪.২, ৪.৩, ৪.৪, ৪.৫, ৪.৬, ৪.৭, ৪.ক, ৪.খ এবং ৪.গ) নির্ধারিত হয় যদিও ৪.ক, ৪.খ এবং ৪.গ এই তিনটি ঠিক তেমনভাবে লক্ষ্যমাত্রা বলা হয় না এগুলোকে ধরা হয় গুণগত শিক্ষা নিশ্চিয়নে Means of Implementation হিসেবে।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-৪ এর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা

৪.১

২০৩০ সালের মধ্যে সকল ছেলে ও মেয়ে যাতে প্রাসঙ্গিক, কার্যকর ও ফলপ্রসূ অবৈতনিক, সমতাভিত্তিক ও গুণগত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে তা নিশ্চিত করা

৪.২

২০৩০ সালের মধ্যে সকল ছেলে ও মেয়ে যাতে প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষাসহ শৈশবের একেবারে গোড়া থেকে মানসম্মত বিকাশ ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে তার নিশ্চয়তা বিধান করা

৪.৩

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের ‍সুযোগসহ সাশ্রয়ী ও মানসম্মত কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও উচ্চ শিক্ষায় সকল নারী ও পুরুষের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে সামন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা

৪.৪

চাকুরি ও শোভন কর্মে সুযোগলাভ এবং উদ্যোক্তা হবার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক দক্ষতাসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দক্ষতাসম্পন্ন যুবক ও প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠির সংখ্যা ২০৩০ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো

৪.৫

অরক্ষিত (সংকটাপন্ন) জনগোষ্ঠিসহ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী, নৃ-জনগোষ্ঠী ও অরক্ষিত পরিস্থিতির মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সকল পর্যায়ে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং শিক্ষায় নারী পুরুষ বৈষম্যের অবসান ঘটানো

৪.৬

নারী পুরুষ নির্বিশেষে যুবসমাজের সবাই এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে সাক্ষরতা ও গণন-দক্ষতা অর্জনে সফলকাম হয় তা নিশ্চিত করা

৪.৭ অপরাপর বিষয়ের পাশাপাশি, টেকসই উন্নয়ন ও টেকসই জীবনধারার জন্য শিক্ষা, মানবাধিকার, নারী পুরুষ সমতা, শান্তি ও অহিংসমূলক সংস্কৃতির বিকাশ, বৈশ্বিক নাগরিকত্ব এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়নে সংস্কৃতির অবদান সম্পর্কিত উপলব্ধি অর্জনের মাধ্যমে সকল শিক্ষার্থী যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে তা নিশ্চিত করা ৪.ক

শিশু, প্রতিবন্ধিতা ও জেন্ডার সংবেদনশীল শিক্ষা সুবিধার নির্মাণ ও মানোন্নয়ন এবং সকলের জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর শিক্ষা পরিবেশ প্রদান করা

৪.খ

উন্নত দেশ ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কারিগরি, প্রকৌশল ও বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মসূচি সহ উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির জন্য উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ, উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে প্রদেয় বৃত্তির সংখ্যা বৈশ্বিকভাবে ২০২০ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো

৪.গ

শিক্ষক প্রশিক্ষেণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ ও উন্ননশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা

“সকলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি” -এসডিজি-৪ নামক যে বৈশ্বিক অভীষ্ট আজ জাতিসংঘের কল্যাণে বিশ্ববাসীর সামনে প্রতিজ্ঞাভরে পূরণীয় সেই স্বপ্ন অনেক আগেই দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যা আলোকপাত করতে আমাদের আবারও দৃষ্টি দিতে হবে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রের জন্য প্রণীত প্রথম সংবিধানের দিকে। তিনি শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে উক্ত সংবিধানের ১৭ ধারায় রাষ্ট্রের কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন “রাষ্ট্র (ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবাং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য ” যা এসডিজি-৪ এর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৪.১ (২০৩০ সালের মধ্যে সকল ছেলে ও মেয়ে যাতে প্রাসঙ্গিক, কার্যকর ও ফলপ্রসূ অবৈতনিক, সমতাভিত্তিক ও গুণগত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে তা নিশ্চিত করা) এর সাথে;

উক্ত ধারার অনুচ্ছেদ (খ) এ অন্তর্ভুক্ত করা হয় “সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজনসিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য” যা এসডিজি-৪ এর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৪.৭ এর বিশ্ব নাগরিকত্ব শিক্ষার সাথে; এবং

উক্ত ধারার অনুচ্ছেদ (গ) এ সংযোজিত “আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য” যা এসডিজি-৪ এর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৪.৬ এর লক্ষ্যমাত্রা (নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে যুবসমাজের সবাই এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে সাক্ষরতা ও গণন-দক্ষতা অর্জনে সফলকাম হয় তা নিশ্চিত করা) এর সাথে সম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

১৯৭২ সালের সংবিধানের ২৮ (২) “রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকরা লাভ করিবেন” এবং ২৮ (৪) নারী ও শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না” এর প্রতি দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় এসডিজি-৪ এর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৪.৫ (অরক্ষিত (সংকটাপন্ন) জনগোষ্ঠিরসহ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী, নৃ-জনগোষ্ঠী ও অরক্ষিত পরিস্থিতির মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সকল পর্যায়ে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং শিক্ষায় নারী পুরুষ বৈষম্যের অবসান ঘটানো) বাস্তবায়নের জন্যই যেন বাংলাদেশ সরকার অনেক আগে থেকেই ভেবে-চিন্তে সংবিধানে উক্ত ধারা অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছে।

জাতির পিতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে সকল শিক্ষার ভিত্তি, কাজেই প্রথমিক শিক্ষাকে সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কাজেই তিনি ১৯৭৩ সালের ১ নভেম্বর প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তার এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের আলোকে ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ প্রাথমিক বিদ্যালয় অধিগ্রহণ আইন পাস হয় এবং ৩৭,০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। তাছাড়া যুদ্ধ শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যেই পঞ্চম শেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূ্ল্যে বই বিতরণের ব্যবস্থা করেন। মুক্তিযুদ্ধ বিধ্বস্ত অর্থনীতির চরম ক্রান্তিলগ্নেও তিনি শিক্ষার গুরুত্ব সামান্যও কমিয়ে দেখেননি।

এসডিজি-৪: সকলের জন্য গুণগত শিক্ষার লক্ষ্য পূরণে অন্যতম অনুসঙ্গ হিসেবে ধরে নেয়া হয় মানসম্পন্ন শিক্ষকের উপস্থিতি। আর এ উদ্দেশ্যে সংযোজিত হয়েছে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৪.গ; যেখানে সূচক হিসেবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, সমযোগ্যতাসম্পন্ন অন্যান্য পেশার সথে শিক্ষকদের বেতন কাঠামোর তুলনামূলক চিত্র ও শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেয়ার হার ইত্যাদি। গুণগত শিক্ষার অন্যতম নিয়ামক মানসম্পন্ন শিক্ষক নিশ্চিতের ভাবনাটা যেন জাতির পিতা ভেবে রেখেছিলেন অনেক আগেই। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের এক প্রচারণায় তিনি সুস্পষ্টভাবে শিক্ষা ও শিক্ষকের জন্য তার ভাবনার কথা জাতির সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেছিলেন, “সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে শিক্ষাখাতে পুঁজি বিনিয়োগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর হতে পারে না। কলেজ ও স্কুল, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করতে হবে। নিরক্ষরতা অবশ্যই দূর করতে হবে।” শিক্ষকের মান মর্যাদা বৃদ্ধিতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বলিষ্ঠ। শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও শিক্ষা উন্নয়নে পেশাজীবী মনোভাব থেকেই তিনি দেশের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিব হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন যোগ্য শিক্ষকদের।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ সরকারের যাত্রা লগ্নেই শিক্ষার জন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৯৭২ সালের ১৫ জানুয়ারি এক ঘোষণা বলে ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বেতন মওকুফ করে দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৬০ ভাগ বিদ্যালয় যা পুননির্মাণসহ শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনে ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সম্মতিক্রমে ৫১ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা করেন। এর একদিন আগেই ঘোষিত হয় পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক প্রদান এবং শতকরা ৪০ ভাগ কম দামে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বই সরবরাহ করা হবে। উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ জারি করা হয়। উক্ত অধ্যাদেশের ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে চিন্তার স্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা ও বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে অধিষ্ঠিত করাই ছিল জাতির পিতার লালিত স্বপ্ন।

শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নে জাতির পিতার ভাবনাসমূহ চূড়ান্তভাবে প্রতিফলিত হয় তার নেতৃত্বে গৃহীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) এ। উক্ত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে ৩১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয় যা ছিল মোট বাজেটের ৭.১%। উক্ত পরিকল্পনায় শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে যে কৌশলসমূহ নেয়া হয়েছিল তা যেন এসডিজি-৪ বাস্তবায়নের আগাম কৌশলপত্র। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গুণগত শিক্ষার লক্ষ্যে যে সকল কৌশলসমূহ গৃহীত হয়েছিল তার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:

(১) বিদ্যমান সুযোগ সুবিধার সর্বোত্তম ব্যবহার (এসডিজি-৪ এর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৪.ক);
(২) প্রশিক্ষিত শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে (এসডিজি-৪ এর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৪.গ);
(৩) অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে ডাবল শিফট চালু (এসডিজি-৪ এর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৪.১);
(৪) স্কুল ও কলেজসমূহের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিজ্ঞানাগার ও অধিক সংখ্যক ব্যাবহারিক পাঠ নিশ্চিতকরণ (এসডিজি-৪ এর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৪.৭);
(৫) ভোকেশনাল ও কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার প্রদান (এসডিজি-৪ এর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৪.৩ ও ৪.৪);
(৬) উচ্চশিক্ষার প্রতি তরুন-তরুণীদের আগ্রহী করে তোলা (এসডিজি-৪ এর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৪.৩);
(৭) কার্যকরী সাক্ষরতা জ্ঞান অর্জনে দেশব্যাপী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ (এসডিজি-৪ এর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৪.৬);
(৮) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও প্রতিষ্ঠানের বাইরে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা (এসডিজি-৪ এর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৪.৭);
(৯) বিশেষ করে নারী শিক্ষার অগ্রগতির জন্য বিশেষ মনোযোগ প্রদান (এসডিজি-৪ এর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৪.৫) ।

এছাড়াও টিচার এডুকেশন, বৃত্তি, কলা ও সংস্কৃতির মতো শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এই পরিকল্পনায়। জাতির পিতার আদর্শ ও চিন্তা-চেতনার দূরদর্শিতার অন্যতম দৃষ্টান্ত এই প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা যার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় বর্তমান বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি-৪ এর প্রতিচ্ছবি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড কোন ব্যক্তির হত্যা ছিল না; এটা ছিল এক মহা আদর্শের হত্যা, এটি ছিল এক স্বপ্নের অপমৃত্যু, এটা ছিল এক হতভাগ্য জাতির দুর্ভাগ্যের পুনর্জন্ম, এটা ছিল একটা জাতিকে হাজার বছর পিছিয়ে দেয়ার কলঙ্কময় আরেক অধ্যায়ের সূচনা। আমরা বাঙ্গালি, শত বাঁধায় হাল না ছাড়ি। আজও আমরা নতুন করে স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্ন দেখছি জাতির পিতার সোনার বাংলার, এক সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ। আজও আমাদের মাঝে স্বপ্নহারা কিছু কিট রয়ে গেছে। উন্নত রষ্ট্রের স্বপ্ন যাদের ছুঁতে পারেনি, যেমন করে ১৯৭১ সালে তাদের পূর্বসূরিদের ছুঁতে পারেনি স্বাধীনতার স্বপ্ন। এদেশের আলো -বাতাসে বেড়ে উঠে, এ দেশের জনগণের টাকা লুটপাট করে এরা পাড়ি জমাচ্ছে পরবাসে। যারা এই সোনার বাংলা ছেড়ে উন্নত জীবন-যাপনের মোহে বিদেশে গিয়ে নিজের নতুন ঠিকানা খুঁজছে তাদের উদ্দেশ্যে কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায় বলব “তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও- আমি এই বাংলার পারে র’য়ে যাব’। কিছু লোক স্বপ্ন দেখুক বা না দেখুক আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নের সাথে মিলিয়ে এক সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখছি যার অন্যতম মাধ্যম হবে মানসম্মত শিক্ষা এবং যা বাংলাদেশকে পৌঁছে দিবে উন্নত রাষ্ট্রের জংসনে।

মোহাম্মদ ফখরুল হাসান
সহকারি অধ্যাপক (হিসাববিজ্ঞান) ও পরিসংখ্যান কর্মকর্তা (প্রেষেণে)
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)
শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

গ্রন্থপঞ্জি:
১. হাসান মোরশেদ। (২০১৮) বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ নির্মাণ। ঢাকা: চর্চা।
২. এইচ. টি. ইমাম। (২০১৮) বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১-৭৫। ঢাকা: হাক্কানী পাবলিশার্স।
৩. কাজী শাহজাহান। (২০২০) বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাভাবনা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ । ঢাকা: স্বদেশ শৈলী পাবলিকেশন্স

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
© সাগরিকা প্রকাশনী ও বই বিপণি । সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত