1. adnanfahim069@gmail.com : Adnan Fahim : Adnan Fahim
  2. admin@banglarkota.com : banglarkota.com :
  3. miraz55577@gmail.com : মোঃ মিরাজ হোসেন : মোঃ মিরাজ হোসেন
  4. ridoyahmednews@gmail.com : Ridoy Khan : Ridoy Khan
  5. zahiruddin554@gmail.com : Md. Zahir Uddin : Md. Zahir Uddin
শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ০৯:২৫ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :

আপনার লেখা গল্প,কবিতা,উপন্যাস, ছড়া গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করতে যোগাযোগ করুন। সাগরিকা প্রকাশনী ০১৭৩১৫৬৪১৬৪৷ কিছু সহজ শর্তে আমরা আপনার পান্ডুলিপি প্রকাশের দায়িত্ব নিচ্ছি। ঘরে বসে যে কোন বই কিনতে বা বিক্রি করতে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।বই বিপণী বিডি।মোবাইলঃ ০১৭৩১৫৬৪১৬৪, www.boibiponibd.com

জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টালে কিছু সংখ্যক সংবাদকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। যোগাযোগ ০১৭৩১৫৬৪১৬৪ অথবা সরাসরি মোহাম্মদপুর মোড় বাসস্ট্যান্ড,ছুটিপুর রোড,ঝিকরগাছা,যশোর।

গ্রন্থঃ বিন্দু বৃত্তান্তে লেখকঃরেশমী রফিক।বাংলার কথা অনলাইন।

প্রতিবেদকের নাম:
  • প্রকাশিত: শনিবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৪৯ বার পড়া হয়েছে

বুক প্রমোশনঃ
বিন্দু বৃত্তান্তে
রেশমী রফিক
পর্ব – ৮
বাসায় ফিরেই হুড়মুড় করে বাড়ির ভেতর দৌড়ে গেল তুর্য। রুপন্তি বাধা দিল না। এসময় তুহিন বাসায় থাকে না। কখনোবা জলদি ফিরলেও নিজেকে আটকে রাখে স্টাডিরুমে। কিন্তু বাড়ির ভেতর ঢুকতেই ডাইনিঙয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল তুহিনকে। তুর্য তখনো ওর নাগাল পায়নি, দৌড়ে যাচ্ছে। চাপা সুরে আর্তনাদ করে উঠল রুপন্তি,
– অ্যাই, তুর্য!
ফোনে কথা বলছিল তুহিন। তুর্যকে লক্ষ করেনি। আর্তনাদ শুনে পেছন ফিরল। রুপন্তির বিস্ফোরিত দৃষ্টি অনুসরণ করে তুর্যকে দেখামাত্র এক ঝটকায় সরে যেতে চাইল বরাবরের মতো। তার আগেই তুর্য ওর পা জাপটে ধরল। হাঁটু ভেঙ্গে মেঝেয় বসে পড়েছে, তবু পা ধরতে ছাড়েনি। আধো বোলে বলল,
– আব্বু… আব্বু… কোলে… আব্বু…
অগত্যা বাধ্য হয়ে ফোন রাখল তুহিনকে। রুপন্তির উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল,
– কতবার বলব, তুর্যকে যেন আমার ত্রিসীমানায় না দেখি? তোমাকে এই বাড়িতে এনেছি ওকে দেখেশুনে রাখতে। চারুকে রেখেছি বেতন দিয়ে। দু-দুটো মানুষ তোমরা, এইটুক বাচ্চাকে সামলে রাখার যোগ্যতা তোমাদের নেই। চারু কোথায়? অ্যাই চারুউউউ…
তুর্যকে ধরতে দৌড়ে আসছিল রুপন্তি। তুহিনের কথা শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল মাঝপথে। নিমেষেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল তার। লিপি দৌড়ে এসেছে রান্নাঘর থেকে। এক ঝলক তাকিয়েই বুঝে গেল ঘটনা কী। দ্রুত এগিয়ে এসে জোরজবরদস্তি তুর্যকে সরিয়ে নিল। ওর কোলের মধ্যে তুর্য নিস্ফল আক্রোশে চিৎকার করছে, গলা ফাটিয়ে কাঁদছে। তুর্যর কান্না সহ্য করতে পারে না রুপন্তি। বুকের ভেতরটা ছ্যাত করে উঠে। কিন্তু আজ মন শক্ত করে কাঁদতে দেখল ছেলেকে। লিপি চলে যেতেই তুহিনের দিকে ফিরল। কয়েক কদম এগিয়ে এসে বলল,
– তুর্যকে এভাবে না কাঁদালে চলত না আপনার?
তুহিন অবাক দৃষ্টিতে তাকাল। বলল,
– আমি কাঁদিয়েছি তোমার ছেলেকে?
– হ্যাঁ, আপনিই ওর এই কান্নাকাটির জন্য দায়ী।
ফোন থেকে মনোযোগ সরাল তুহিন। বলল,
– তুমি নিজেই দায়ী, আমি নই।
– আমি?
– হ্যাঁ, তুমি। সহজ কথা তোমার মাথায় ঢুকে না। অনেকবার বলেছি, তুর্যকে আমার থেকে দূরে রাখবে। কিন্তু তুমি সে চেষ্টা করো না। একজন মানুষ ফোনে কথা বলছে। তুমি সেটা চোখেই দেখ না। তুর্য এদিকে দৌড়ে আসছে দেখেও ওকে আটকানোর চেষ্টা করোনি। নাকি ধরে নেব ইচ্ছে করেই ওকে লেলিয়ে দিয়েছ আমার পেছনে?
এবারে রুপন্তির অবাক হবার পালা। বলল,
– আমি কেন তুর্যকে লেলিয়ে দেব? তুর্য আপনাকে পছন্দ করে…
– লিসেন রুপ স্যরি রুপন্তি, প্রতিদিন এই নাটক আমার ভালো লাগে না। একবার-দুবার এমন হতে পারে। তাই বলে এভরি ফাকিং সিঙ্গেল ডে একই কাহিনি বরদাশত করব না। আমার মনে হয়, তুমি নিজেই তুর্যকে লেলিয়ে দাও, নয়তো এইটুক বাচ্চার এমন আচরণ আনবিলিভেবল। কে আমি? ওর চাচা। জন্মের পর এই প্রথম আমাকে দেখেছে আর দেখেই এত পাগল হয়েছে, তুমি ওকে জন্মের পর থেকে আগলে রাখছ কিন্তু সে তোমার কাছে থাকতেই চায় না। জোরজবরদস্তি তোমার কোল থেকে নেমে আসে। এইটুক বাচ্চাকে সামলে রাখতে হিমশিম খাও তুমি। এগুলো নাটক নয় তো কী? আমাকে কি বুদ্ধু মনে হয়? ভেবেছ, তোমার এই নাটক আমি কখনো ধরতে পারব না?
রুপন্তি বাকরুদ্ধ। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত সুরে বলল,
– আমি সবসময় চেষ্টা করি ওকে আপনার থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে।
– কী চেষ্টা করছ, দেখতেই পাচ্ছি। দুবছরের বাচ্চার সাথে পেরে উঠার যোগ্যতাটুকু তোমার নেই।
– আপনার আছে? আমার যোগ্যতা নিয়ে বলছেন। আপনার নিজের যোগ্যতা আছে কি না দুই বছরের বাচ্চার সাথে পেরে উঠার, সেটা বলেন।
– আমার যোগ্যতা নিয়ে কথা উঠছে কেন?
– কারণ তুর্যকে আপনি ঠিকমতো টেককেয়ার করছেন না। শুধু টাকাপয়সা ঢাললেই হয় না, বাবার আদর দরকার ওর। সবাইকে বলেন, তুর্য আপনার ছেলে। অথচ সেই ছেলে যখন আপনার কাছে আসতে চায়, আপনি দূর-দূর করেন। আজ তুর্য আপনার নিজের ছেলে হলে এভাবে কাঁদাতে পারতেন ওকে? অবশ্যই না। নিজের ছেলেকে ঠিকই কোলে নিয়ে আদর করতেন। সে আপনাকে আব্বু ডাকে, আপনার কোলে উঠতে চায়। আপনার মনে একটু মায়া হয় না। আপনি ওর ভেতরকার কষ্ট বুঝেন না।

              বিজ্ঞাপন

গ্রন্থ প্রকাশে আপনার পাশে সাগরিকা প্রকাশনী 

যোগাযোগঃ ০১৭৩১৫৬৪১৬৪

– বুঝতে চাই না আমি। বুঝার চেষ্টাও করতে চাই না। ক্লিয়ার? সবাই তোমার মতো হয় না। তুমি জন্ম না দিয়েও ওর আম্মু হতে পেরেছ। আমার থেকে তেমন কিছু আশা না করাই ভালো। আমার যতটুকু সাধ্য, ততটুকুই করছি। প্রমিজড বলেই করতে হচ্ছে।
– প্রতিদিন এক বুলি শোনান, প্রমিজ করেছেন। কার কাছে প্রমিজড আপনি?
– সেই কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।
– অবশ্যই বাধ্য। আমার ছেলেকে দেখেশুনে রাখতে কে এই প্রতিজ্ঞা করিয়েছে, জানার অধিকার আমার আছে।
তুহিন চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
– লিমিট ক্রস করো না, রুপন্তি।
– কেন? কী করবেন লিমিট ক্রস করলে?
– দুদিন ধরে এই বাড়িতে এসে তোমার মুখে খই ফুটেছে। আমার খেয়ে-পরে, আমার মুখের উপর তর্ক করতে শুরু করেছ। তুর্যকে আমার পেছনে লেলিয়ে দিয়ে নাটক করছ, আবার কৈফিয়ত চাচ্ছ। তোমার স্পর্ধা দেখে অবাক হচ্ছি। তোমার মতো দুই টাকার মেয়ের এত স্পর্ধা হতে পারে, আমার মাথায় আসেনি আগে। তবে এখন থেকে মাথায় রাখব। কোনোদিন যদি তোমার ফ্যামিলি বা ছেলের সাথে কোনোরকম অঘটন ঘটে, তার জন্য রেস্পনসিবল থাকবে তুমি। তোমার এই স্পর্ধাই সেদিন কাল হয়ে দাঁড়াবে। তখন কিন্তু আমার দোষ দিতে এসো না।
*****
রুপন্তির হাতে স্মার্টফোন। লিপিকে দিয়ে পাঠিয়েছে তুহিন। আগের ফোনটা কিপ্যাডসমেত সস্তাদামের নোকিয়া ছিল। এটায় কিপ্যাড নেই। কীভাবে ব্যবহার করে, কে জানে। স্কুলে কয়েকজনের হাতে এরকম ফোনসেট দেখলেও সেগুলো অত দামি নয়। তুহিনকে কি অনুরোধ করবে ফোনসেটের ব্যবহার শিখিয়ে দিতে? না, থাক। তুহিনের যেমন স্বভাব, এটাকে ইস্যু বানিয়ে গা-জ্বালানো কথা শোনাবে। এমনিতেই সেদিনের তর্কাতর্কির পর থেকে অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে আছে সে। কথা বলছে না; কিছু বলতে হলে লিপির মাধ্যমে খবর পাঠাচ্ছে। তার চেয়ে বরং রঞ্জুর থেকে শিখে নেবে। ফোনটা বেডসাইড টেবিলে রেখে শুয়ে পড়ল রুপন্তি। পাশেই তুর্য ঘুমুচ্ছে। অনেক দাঙ্গা-হাঙ্গামার পর তাকে ঘুম পাড়ানো গেছে। দুপুরে ঘুমুলে বিকেল পার করে সন্ধ্যায় উঠবে। তখন তুহিনের সাথে দেখা হবার সম্ভাবনা নেই। এরপর রাতে ঘুম পাড়ানো কঠিন হয়ে যায়। তবু রক্ষা, রাত এগারোটার পর জেগে থাকতে পারে না তুর্য। তুহিনও বারোটার দিকে ফেরে। সেদিনের পর এই একটা সমাধানই খুঁজে পেয়েছে রুপন্তি।
তুর্যকে বুকে টেনে নিতেই দুচোখে ঘুম নেমে এসেছিল ওর। প্রতিদিন দুপুরে তুর্যকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে তার নিজেরও ভাতঘুমের অভ্যেস হয়েছে। সুযোগ পেলেই আরাম চায় শরীর। বাড়ির কাজকর্ম সব গৃহকর্মীরাই করে। এরা কমবেশি লক্ষী। একবারের জায়গায় দুবার বলতে হয় না কিছু। সবথেকে লক্ষী লিপি। রুপন্তির তদারকির ধরন বুঝে নিয়েছে চটজলদি। প্রায়ই রুপন্তির নির্দেশের আশায় না থেকে আগেভাগে কাজ সেরে ফেলে। ওর কারণেই মূলত সংসারে তেমন মনোযোগ দিতে হয় না রুপন্তিকে। তার সময় কাটে তুর্যকে ঘিরে। তুর্যর কাজগুলো নিজেই করে। চারু বেশিরভাগ সময় অলস বসে থাকে। ওকে বিদায় করে দেবার কথা বেশ কবার ভেবেছে রুপন্তি। শেষমেশ মত পালটেছে। একদিন চারুর মতো জীবন তারও ছিল। চাকরি করে সংসারে টাকার যোগান দিত। চারুর বাবা অনেক বছর যাবত অসুস্থ। প্রায়ই তাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াতে হয়। মায়ের ডায়বেটিস ধরা পড়েছে। বড় বোন স্বামী পরিত্যক্তা। তিন কন্যাসন্তানের জন্ম দেবার অপরাধে বাবার সংসারে ফিরতে হয়েছে তাকে। বড় ভাই ছিল, জীবনযুদ্ধে টিকতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। মেজ ভাই স্বল্প বেতনের চাকরি করে। বউ-বাচ্চা নিয়ে আলাদা সংসার তার। বাবামায়ের সংসারে টাকার যোগান দেবার সামর্থ্য নেই। আরও ভাইবোন আছে চারুর। সব মিলে দশ-বারো জনের বিশাল সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সে। চাকরি হারালে কীরকম বিপর্যয় ঘটবে, সহজেই অনুমেয়। তুহিনের তো টাকার অভাব নেই। এই চাকরির ছুতোয় যদি চারুর পুরো পরিবার খেয়েপরে বাঁচতে পারে, তাহলে কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। একারণে নির্দিষ্ট বেতনের বাইরেও চারুকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে রুপন্তি। সময় পেলে চারুর জীবনের গল্প শুনে। কখনোবা নিজের অতীত জীবনের সাথে মেলায়। নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে হয় তখন। তুহিন সত্যিকার অর্থেই রুপকথার রাজকুমার। যাদুর কাঠি ছুঁয়ে পাল্টে দিয়েছে ওদের জীবন। রঞ্জুর চাকরি, অবন্তির পড়াশুনা, ধানমন্ডির ফ্ল্যাট, রাজপ্রাসাদে বিলাসবহুল জীবনযাপন, কল্পনাতীত সংসার, তুর্যকে আজীবন নিজের করে পাওয়া, জীবনের এই লেনদেনে তুহিন যতটা দিয়েছে, বিনিময়ে বলতে গেলে কিছুই পায়নি। যদিও তার উদ্দেশ্য ধোঁয়াশায় ভরপুর। তবু মানুষটা ওকে চোরাবালি থেকে টেনে তুলেছে। একের পর এক আপনজন হারিয়ে জীবন নামের সাগরে হাবুডুব খাচ্ছিল, তখনই ভোজবাজির মতো উদয় হয়েছে। এই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই তুহিনের অপমানসূচক কথাবার্তা নীরবে হজম করে।
আচমকা রিঙটোন শুনে ধড়মড়িয়ে উঠল রুপন্তি। ফোনসেট বাজছে, স্ক্রিণে তুহিনের নাম। তুহিন নিজেই নম্বর সেভ করেছে। ইতস্তত ভঙ্গিতে স্ক্রিণের সবুজরঙা টেলিফোনের উপর চাপ দিল। কাজ হলো না তাতে। হঠাৎ রিঙ বন্ধ হয়ে গেল। মিনিটখানেক পর রুমের দরজায় নক করার শব্দ হলো। দরজার বাইরে দাঁড়ানো তুহিন। দরজা খুলতেই চেহারায় বিরক্তি ফুটিয়ে বলল,
– ফোন রিসিভ করছ না কেন? সমস্যা কী তোমার?
– আপনিই ফোন করেছিলেন?
– স্ক্রিনে তো আমার নামটাই ছিল। নাকি অন্য কারো নাম দেখেছ?
– জি, আপনার নাম।
– তাহলে কল রিসিভ করলে না কেন?
স্মার্টফোন ব্যবহার করতে না জানার কারণ চেপে গেল রুপন্তি। যেচে পড়ে খোঁচামারা কথা শোনার ইচ্ছে নেই। তাই বলল,
– আপনি তো বাসায় ছিলেন। এজন্য কনফিউজড ছিলাম একটু।
– তুমি কি আশা করো, আমি নিজে এসে তোমার রুমের দরজায় নক করব?
– না, মানে সবসময় তো লিপিকে দিয়ে খবর পাঠান।
– লিপিকে দিয়ে খবর পাঠাতে হলে ওকে ডাকতে হবে প্রথমে। তার চেয়ে নিজে এসে নক করাটা বেশি সুবিধার। তুমি বোধহয় এটাই চাচ্ছিলে। তোমার ছেলে তো সারাক্ষণই তোমার আশপাশে থাকে। আমাকে দেখামাত্র সে দৌড়ে আসবে অ্যান্ড অল আদার ড্রামাস…
– তুর্য ঘুমুচ্ছে।
– সেটা আমার জানার কথা নয়। যাকগে, তোমাকে ফোনটা কিনে দেয়া হয়েছে যেন দরকার পড়লে কথা বলতে পারি। কষ্ট করে তোমার চেহারা দেখতে হবে না আর।
রুপন্তির চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। চোখের পানি আটকাতে ঝট করে মাথা নিচু করল সে। বলল,
– আমাকে দেখতে ইচ্ছে করে না, অথচ নিজেই সেধে বিয়ে করলেন। আমি…
– ফর গডস সেক, রুপন্তি। স্টপ দিস ফাকিং চিটচ্যাট। কী করেছি, কেন করেছি, এত কৈফিয়ত দিতে ইন্টারেস্টেড নই। এখন থেকে যতবার ফোন করব, কল রিসিভ করবে। আমি বাসায় বসে ফোন করি নাকি বাসার বাইরে গিয়ে, দ্যাটস নট ইউর হেডেক। বুঝেছ?
– জি।
– গুড। স্টাডিরুমে এসো। তোমার সাথে কথা আছে।
স্টাডিরুম সবসময় তুহিনের দখলে থাকে। মাঝেমধ্যে দরকারী কথাবার্তা বলতে ডাকে রুপন্তিকে। আয়তাকার এই রুমে জানালার অংশটুকু বাদ রেখে চারপাশের দেয়াল জুড়ে ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত কাঠের তাক। তাতে অসংখ্য বই সাজানো। উপরের তাকগুলোয় রাখা বই হাতের নাগালে পাবার জন্য কাঠের মই আছে। মাঝখানে পুরনো আমলের কারুকাজ করা মেহগনি কাঠের টেবিল। একপাশে পিয়ানো। এই পিয়ানো বলিউডের মুভিগুলোয় দেখা যায় অহরহ। এরকম এক রুমের মালকিন হবার স্বপ্ন রুপন্তি অবচেতন মনে পুষেছে বহু বছর। আফসোস, অন্য রুমগুলোর চাবি বুঝিয়ে দিলেও এই রুমের চাবি নিজের কাছে রেখেছে তুহিন।
টেবিলের উপর শ্যাওলারঙা ডাইরি দেখামাত্র সতর্ক হলো রুপন্তি। চট করে একবার দেখল তুহিনকে। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে। পুরো সিগারেট শেষ না করে পেছন ফিরবে না। এই ফাঁকে কি ডাইরি খুলে দেখবে একটু? হাত নিশপিশ করছে। কী লেখা আছে ওটায়, জানতে মন আঁকুপাঁকু করছে। উত্তেজনা প্রশমিত হচ্ছে শরীর জুড়ে। ঠিক যেমন হয় চোখের সামনে সাত রাজার ধন থাকলে। আপাতদৃষ্টিতে ডাইরিটা সাত রাজার ধনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ওর বিশ্বাস, তুহিনের সমস্ত অপরাধের প্রমাণ আছে এতে। ইশসস, কবে যে ডাইরিটা হাতে নিতে পারবে! একবার সুযোগ মিলুক; তুহিনকে ধরাশায়ী করার চরম মওকা পেয়ে যাবে। দেখিয়ে দেবে খেল কাকে বলে, কত প্রকার, কী কী।
সিগারেট শেষ করে পেছন ফিরল তুহিন। অবশিষ্টাংশ অ্যাশট্রেতে রেখে রুপন্তিকে বলল,
– কাল সন্ধ্যেয় একটা পার্টি অরগানাইজ করেছি। তোমার কাজ পার্টি অ্যাটেন্ড করা, গেস্টদের ওয়েলকাম জানানো। হোস্টরা যা করে আর কী। তোমার ছেলে দোতলায় থাকবে। চারু থাকবে ওর সাথে। চারুকে আগেই বলে রাখবে কাল ফিরতে দেরি হবে। যত রাতই হোক, ড্রাইভার পৌঁছে দেবে বা চাইলে এখানে থাকতে পারে, হোয়াটএভার।
– জি। পার্টি কীসের?
– ওয়েডিং রিসিপশন।
রুপন্তি অবাক সুরে বলল,
– ওয়েডিং রিসিপশন?
– হ্যাঁ, বিয়ের অনুষ্ঠান। সোজা বাংলায় নতুন বউ দেখতে আসবে সবাই।
– সবাই তো এসেছিল একদিন।
– তারা ফ্যামিলি পারসন। পার্টিতে মোস্টলি বিজনেস পিপল আসবে। অফিস স্টাফ, বিজনেস পার্টনারস, সোসাইটি পিপল। কাজিনও আসবে, জেনিসের ভাই। ফ্যামিলি গেদারিঙয়ে ও ছিল না। ব্যাংকক গিয়েছিল সেসময়।
– কিন্তু রিসিপশন করবেন কেন?
– বিয়ে করলে তো রিসিপশন পার্টি করতেই হয়।
– হ্যাঁ, কিন্তু পার্টি তো আমার জন্য না।
– তাহলে কার জন্য?
– মানে বলছিলাম, আমরা সত্যিকারের হাজব্যান্ড-ওয়াইফ নই……
– সত্যিকারের হাজব্যান্ড-ওয়াইফ নই মানে কী? আমরা মিথ্যেমিথ্যি বিয়ে করেছি?
– না, ওই… ম্যারেজ অফ কনভিনিয়েন্স…
– বাইরের মানুষের সামনে নরমাল হাজব্যান্ড-ওয়াইফের মতো চলব, এটাই কথা ছিল।
– জি।
– সো, পার্টি হবেই।
– জি।
– তোমার জি জি শুনলে আমার মেজাজ খারাপ হয়। তুমি কি ইচ্ছে করে এমন করো?
– স্যরি।
– জানো কেবল স্যরি বলতে। আর কিছু বলার যোগ্যতা নেই। এনিওয়ে, একটা ড্রেস কিনেছি তোমার জন্য। কাল পার্টিতে পরবে। ট্রায়াল দিয়ে দেখ সাইজ ঠিক আছে কি না। নয়তো চেঞ্জ করে আনব।
শপিঙ ব্যাগ নিয়ে শোবার রুমে ফিরল রুপন্তি। ড্রেসিংরুমে গিয়ে গাউন বের করল প্যাকেট থেকে। দেখতে অসম্ভব রকমের সুন্দর; দেখলেই মনে অদ্ভুত রোমাঞ্চের ছোঁয়া লাগে। মিষ্টি গোলাপী রঙের এই গাউনটা টু-পিস। স্ট্র্যাপলেস গাউন, বুকলাইন থেকে পা পর্যন্ত লম্বা। পাতলা ওয়েটলেস কাপড়ের নিচে সাটিন লাইনিঙ। নিচে অনেকখানি ঘের। কয়েক ধাপে একই রঙের মখমল দিয়ে ঘেরের গভীরতা বাড়ানো হয়েছে। তাতে পাথর আর মুক্তার কারুকাজ। গাউনের সাথে ফুলহাতা কোটি। কোটিতে লাইনিঙ নেই, পাতলা ওয়েটলেস কাপড়ের তৈরি। তাতে পাথর আর মুক্তোর জমকালো কারুকাজ। লম্বায় কোমর সমান। সামনের দিকটা খোলা, কোনো বোতাম নেই। রুপন্তির দম আটকে আসতে চাইল। সত্যিই কি এত সুন্দর গাউন পরার সৌভাগ্য নিয়ে জন্মেছে সে? নাকি পুরোটাই স্বপ্ন? হয়তো একটুপর ঘুম ভাঙ্গবে। চোখ মেলে নিজেকে আবিস্কার করবে পুরনো সেই ঘুপচি ঘরের বিছানায়। মাথার উপরের সিলিং ফ্যান নষ্ট। জানালা খোলা থাকলেও বাতাস নেই। প্রচন্ড গরমে ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে আছে। গোসল করা অতি আবশ্যক, কিন্তু ওয়াশরুমে পর্যাপ্ত পানি নেই। যেটুকু আছে, তা দিয়ে সারাদিন চলতে হবে। নাহ, স্বপ্ন নয়। এই মুহূর্তে সজ্ঞানে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। তবু, স্বপ্নের মতো লাগছে। অতি আনন্দে শরীর ঝিমঝিম করছে রুপন্তির। পরনের জামা খুলতে কত রকমের হ্যাপা যে হচ্ছে। কতক্ষণে গাউন পরে আয়নায় দেখবে নিজেকে, তর সইছে না। অপ্রত্যাশিত আনন্দে বিভোর হচ্ছে ভেবে, এই গাউন পরে আগামীকাল তুহিনের পাশে দাঁড়াবে। কতশত মেহমান আসবে। চারপাশে শুধু ক্যামেরার ক্লিক-ক্লিক চলবে। মিডিয়ার লোকও থাকবে নিশ্চয়ই। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীর বিয়ের খবর আর ছবি পত্রিকায় ছাপা হবে। পুরো বাংলাদেশ জানবে ওকে, দ্য অনলি মিসেস ইফতেখার!
হঠাৎই থমকে গেল সে। কল্পনার জগত থেকে ফিরল বাস্তবে। ওর জানামতে, তুহিনের পছন্দের মানুষ আছে। ওই মেয়েকে নিয়ে ওয়াটারলিলি গিয়েছিল। তবে কি বিয়ে করবে না? এই বিয়ের কারণে কি ওদের সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে? যাকগে, অত চিন্তাভাবনা করে লাভ নেই। সময় হলেই সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে। বাড়তি সতর্কতার সাথে গাউনটা পরল রুপন্তি। সাইজ ঠিক আছে, শরীরের সাথে খাপে-খাপে মিলে গেছে। সমস্যা হচ্ছে, এরকম গাউন পরে অভ্যস্ত নয় সে। সবসময় ঢিলেঢালা জামাকাপড় পরে। গাউনটা লম্বায় বেশ বড়। এটা বোধহয় এভাবেই পরার নিয়ম। নিচের অংশ গড়াগড়ি করবে মেঝেয়। এলোমেলো খোঁপা খুলতেই পিঠের উপর ছড়িয়ে পড়ল চুল। আয়নায় নিজেকে দেখে সম্মোহন লাগল রুপন্তির। সত্যিই কি এত সুন্দর সে? নাকি গাউনের কারণে সুন্দর লাগছে। মিষ্টি গোলাপী রঙের খানিকটা যেন শরীরে লেগে গেছে। মোবাইল ফোনের রিঙটোন শুনে সংবিৎ ফিরল ওর। তড়িঘড়ি করে ফোন হাতে নিতেই চাপ লেগে কীভাবে যেন রিসিভ হয়ে গেল। ওপাশ থেকে তুহিন বলল,
– আর কতক্ষণ লাগবে?
– এই তো আসছি। ট্রায়াল দিচ্ছিলাম।
– একটা ড্রেস ট্রায়াল দিতে এতক্ষণ লাগে? ইউ আর ইম্পসিবল!
– জি, মানে বেশিক্ষণ লাগবে না।
– ড্রেস ফিট হয়েছে ঠিকমতো?
– হ্যাঁ, কিন্তু এক সাইজ বড় লাগবে। লম্বাও ছোট করতে হবে।
– তুমি কি এখনো ড্রেসটা পরে আছ নাকি পাল্টে ফেলেছ?
– এখনো পরে আছি।
– তাহলে স্টাডিরুমে চলে এসো। দেখি কী প্রবলেম।
রুপন্তি নার্ভাস ভঙ্গিতে তাকাল আয়নার দিকে। গাউন পরে সে কিছুতেই তুহিনের সামনে যেতে পারবে না, আগামীকাল মেহমানের সামনে যাওয়া দূরে থাক। এসব গাউন মুভির নায়িকাদের জন্য। তাছাড়া, রিসিপশন পার্টিতে নববধূর শাড়ি পরার নিয়ম। এই আক্কেলজ্ঞান কি তুহিনের নেই? নাকি সে ভুলে গেছে এটা বাংলাদেশ? এখানে বিদেশি জামাকাপড় পরাটা মানায় না।
১৪
স্টাডিরুমের দরজা ভেজানো। ভেতরে উঁকি মেরে তুহিনকে দেখা গেল না। তবে টেবিলে শ্যাওলারঙা ডাইরি আছে। চোখ পড়তেই ডাইরিটা চুম্বকের মতো টানল রুপন্তিকে। দ্রুত দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে। পরমুহূর্তে ঘটে গেল অঘটন। দরজার পাশে কাঠের মই টেনে এনেছিল তুহিন। উপরে উঠে মাত্রই দুটো বই হাতে নিয়েছে, অমনি দরজা ঠেলে এক গোলাপীরঙা পরীকে ঢুকতে দেখে তার পিলে চমকে গেল। তাল হারিয়ে সে ধপাস করে পড়ল মেঝেয়। ঘটনা এত দ্রুত ঘটল, রুপন্তি এগিয়ে এসে পতন ঠেকাতে পারল না। তুহিনকে দরজার পাশে মইয়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে নিজেও কম চমকায়নি। ভেবেছিল, কোনো কারণে স্টাডিরুমের বাইরে গেছে তুহিন।
মেঝেয় পুরু কার্পেট বিছানো। তবু ব্যাথা পেয়েছে তুহিন। চিৎ হয়ে পড়ায় মাথায় আর পিঠে লেগেছে। রুপন্তি ওকে টেনে তুলল। জিজ্ঞেস করল খুব লেগেছে কি না। তুহিন উত্তর দিল না। ঘটনার আকস্মিকতা আর ব্যাথায় বাকরুদ্ধ সে। হাত থেকে বইগুলো পড়ে গেছে, সেদিকে ইশারা করল। রুপন্তির ওগুলো তুলে টেবিলে রাখল। তুহিনকেও চেয়ারে বসিয়ে দিল। গুরুতর কিছু হয়নি। কোথাও কাঁটেনি বা ছিলে যায়নি, কেবল পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছে। যত না ব্যাথা পেয়েছে, তার থেকে বেশি চমকেছে। এখনো সেই চমকের রেশ কাটেনি। রুপন্তি ওর খুব কাছেই দাঁড়ানো। তার চোখেমুখে উদ্বিগ্নতা। চোখ তুলে ওর দিকে তাকাতেই পারছে না তুহিন। রুমে ঢোকার সময় রুপন্তির গায়ে ওড়না জড়ানো ছিল। সেই ওড়না এখন মেঝেয় গড়াগড়ি করছে। খোঁপা খুলে গেছে। আলুথালু বেশে রুপন্তিকে দেখে মনে হচ্ছে অপার্থিব জগতের অপুর্ব রুপবতী এক মানবী। এই মানবীর দিকে একবার তাকালে চোখ সরানো দায়। বেশিক্ষণ ঘোর থাকল না। চটজলদি নিজেকে সামলে নিল তুহিন। মেজাজ তুঙ্গে উঠে গেছে, পারলে রুপন্তিকে চিবিয়ে খায়। থার্ডক্লাস মেয়ে জানেই না রুমে ঢোকার আগে দরজায় নক করতে হয়, ভেতরে কেউ থাকলে তার অনুমতি নিতে হয়। আগামীকাল কি না এই মেয়েকে মিসেস ইফতেখার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবে। মানসম্মানের কীরকম দফারফা হবে, তা আর বলতে! গম্ভীর সুরে বলল,
– কমনসেন্স নেই তোমার। এভাবে কেউ রুমে ঢোকে? ঢোকার আগে নক করতে হয়, জানো না? তুমি যতটা না প্রিয়ন্তির বোন, তারচে বেশি জাহিনের শ্যালিকা। ডিসগাস্টিং!
– স্যরি।
– গেট আউট ফ্রম হিয়ার।
– ইয়ে, ড্রেস দেখবেন না?
– ড্রেস দেখেশুনেই এনেছি। আবার নতুন করে কী দেখব?
– আপনিই বললেন…
– তুমি যাবে এখান থেকে?
– স্যরি, বুঝতে পারিনি আপনি এভাবে…
তুহিন ধমকের সুরে বলল,
– লিভ মি অ্যালোন।
কান্না পেল রুপন্তির। ক্ষেপে যাবার কী হলো? ওকে রুমে ঢুকতে দেখে তুহিন চমকে যাবে, সে কি জানত? তুহিন নিজেই ডেকে পাঠিয়েছে। তার জানা উচিত ছিল, কিছুক্ষণের মধ্যে সে আসবে। নিজ দোষে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছে আর রাগ ঝাড়ছে ওর উপর। ডেকে এনে অপমান করার মানে কী? চোখ উপচে কান্না বেরিয়ে আসার আগেই দরজার দিকে পা বাড়াল সে। বেরিয়ে যাবার আগমুহূর্তে পেছন থেকে তুহিন বলল,
– স্যরি।
থমকে দাঁড়াল রুপন্তি। চোখের পানি বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। তুহিনের স্যরি শুনে কান্নার বেগ বাড়ল। স্যরি-ই যদি বলবে, তাহলে অমন দুর্ব্যবহার করল কেন? পেয়েছে এক কথা, জাহিনের শ্যালিকা। ঘৃণাভরা কন্ঠে এই কথা শুনলে গালির থেকে কোনো অংশে কম লাগে না। আজকাল এই গালি অহরহ শুনতে হয়। তবু সে তুহিনকে উপেক্ষা করতে পারে না। বিরুপ আচরণের কারণে দূরে সরে থাকলেও ডাকামাত্র দৌড়ে যায় সামনে। বুকের ভেতরটা তিরতির করে কাঁপতে থাকে তখন। এই অনুভূতির নাম সে জানে না, জানতেও চায় না। কেবল এতটুকু জানে, তুহিন ওর জীবনে বিশেষ একজন হলেও তার জীবনে সে মুল্যহীন।
উঠে দাঁড়িয়েছে তুহিন। রুপন্তি চোখ মুছে পেছন ফিরল। শান্ত সুরে বলল,
– পার্টিতে এই ড্রেসটা পরতে পারব না আমি। আগে কখনো পরিনি।
– কখনো পরোনি তো কী হয়েছে? এখন পরবে।
– পারব না।
তুহিনের গলা চড়তে শুরু করল আবার,
– পারতে হবে। আগে পরিনি, কখনো পরিনি এসব এক্সকিউজ বাদ দাও। তোমাকে মনে রাখতে হবে, তুমি এই বাড়ির বউ। তোমাকে সোসাইটির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। আর সেজন্য…
– যদি মনে করেন এই ড্রেস না পরলেই নয়, তাহলে আমি পার্টি অ্যাটেন্ড করব না।
তুহিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– পার্টি তোমার জন্যই। তুমি না থাকলে চলবে কী করে?
– (নিশ্চুপ)
– সবাই জানে মিসেস ইফতেখার ভুল করেও সাধারণ কেউ হবে না। তুমি এই সোসাইটির নও, তাই এখনো খবরটা ছড়ায়নি মিসেস ইফতেখার কে। সবাই সারপ্রাইজের অপেক্ষা করছে। ব্যাপারটা কি বুঝাতে পারলাম? কালকের পার্টিতে তোমার ড্রেসআপ, মেকআপ, হেয়ারস্টাইল সবকিছু ইউনিক হতে হবে। এই ড্রেসটা এক্সক্লুসিভ। স্পেশাল অর্ডার করে আনিয়েছি। তোমার গায়ে ফিট হবার জন্য আরও দুটো সাইজ রেডি আছে ওই শপে।
– আপনি ভুলে যাচ্ছেন, আমি মধ্যবিত্ত ফ্যামিলিতে জন্ম নেয়া সাধারণ কেউ। এই ড্রেস পরলেই স্পেশাল হয়ে যাব না।
– এই ড্রেস পরতেই হবে। ইটস অ্যান অর্ডার। তোমার ভালো লাগুক আর না লাগুক।
– আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমাকে কিনে এনেছেন।
– কিনেই এনেছি। কীভাবে জানো? তোমার মা-ভাইবোনের ভরণপোষণের দায়িত্ব আমার না। তোমাকে বিয়ে করে তোমার মায়ের টেনশন কমানোর দায়িত্বও আমার না। তুর্যকে এমনিতেও পেতাম। কাস্টডির জন্য কোর্টে আবেদন করলে সময় লাগত, কিন্তু পেতাম নিশ্চিতভাবেই। তবু সেদিকে পা বাড়াইনি। তোমার মায়ের সাথে কথা বলেছি, তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি। তোমার ফ্যামিলির সমস্ত রেস্পনসিবিলিটি নিয়েছি। বিনিময়ে কী পেয়েছি? গেয়ো, আনস্মার্ট, ক্ষ্যাত বউ। ডু আই ডিজার্ভ দ্যাট?
– কেন করেছেন এসব? কে বলেছিল আমাকে বিয়ে করতে? আমরা তো আপনার কাছে টাকাপয়সা চাইতে আসিনি। আপনিই গিয়েছিলেন। আগ বাড়িয়ে আমার ফ্যামিলির দায়িত্ব নিয়েছেন। নিশ্চয়ই কোনো স্বার্থ আছে। আপনার মতো বিজনেসম্যান কোনো কারণ ছাড়া একটা ফ্যামিলির পেছনে এতটা ঢালবে না।
– স্বার্থ তো আছেই। স্বার্থ ছাড়া তোমার মতো লো-ক্লাস ফ্যামিলির মেয়েকে বিয়ে করার প্রশ্নই আসে না। এটা পাগলেও বুঝে।
– কী স্বার্থ আপনার?
উত্তর দিতে গিয়ে থমকে গেল তুহিন। কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে দেখল রুপন্তির আগুনঝরা চোখ। তারপর ঠান্ডা সুরে বলল,
– সেটা তোমার না জানলেও চলবে। শুধু এটুকুই জেনে রাখ, আমি তোমাদের পেছনে কাড়ি-কাড়ি টাকা ঢেলেছি। তোমার ভাইয়ের এমন জায়গায় জব হয়েছে, যেখানে তোমার চৌদ্দগুষ্ঠির কেউ জব করার কথা স্বপে ভাবেনি। তোমার বোন এমন স্কুলে পড়ছে, যেখানে পড়ার সৌভাগ্য তোমাদের হয়নি। ওরা যে ফ্ল্যাটে থাকে, তার আশপাশে পা দেবার সাহস ছিল না। আমি চাইলে সুন্দরী, স্মার্ট কাউকে বিয়ে করতে পারতাম। তা না করে তোমার মতো ক্ষ্যাতকে বিয়ে করেছি, যার কি না আমার বউ হবার কোনো যোগ্যতা নেই।
– আমি তো আপনাকে বিয়ে করতে চাইনি।
– আমিও জোরজবরদস্তি করিনি। বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি। তোমার ফ্যামিলি রাজি হয়েছে, তুমিও হয়েছ। তারপর ওই ঘুপচিতে গিয়ে সসম্মানে বিয়ে করে নিয়ে এসেছি। আর এখন বলছ তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাওনি? ইজ দ্যাট অ্যা জোক? তুমি কে আমাকে বিয়ে করতে না চাওয়ার? তোমার মতো মেয়ে আমি গোণাতেই ধরিনি, বিয়ের চিন্তা করা দূরে থাক। এই যে পাওয়ার, প্রেস্টিজ, লাক্সরিয়াস লাইফ পাচ্ছ, যদি বলি এসবের লোভে বিয়েতে রাজি হয়েছ তুমি! প্রস্তাব পাবার পর উপর দিয়ে ভাব দেখাচ্ছিলে খুব। তলে তলে খুশিতে লাফাচ্ছিলে। তোমাদের এই সস্তা পলিটিক্স ভালোভাবে জানা আছে আমার। আমি যেমন তোমাকে স্বার্থের জন্য বিয়ে করেছি, তেমনি তোমারও স্বার্থ ছিল। দিস ইজ দ্য বিটার ট্রুথ অ্যান্ড ইউ হ্যাভ টু অ্যাকসেপ্ট ইট। সো, এই যে চেহারায় ভাব ধরে রেখেছ বিয়ে করে আমার চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে ফেলেছ, এটা দূর করো। তোমার সাত জন্মের কপাল, তোমাকে বিয়ে করেছি আমি। তোমার ফ্যামিলিকে আমার লেভেল পর্যন্ত টেনে এনেছি। জাহিনের রুচি খারাপ জানতাম। তাই বলে এত খারাপ, জানতাম না। ন্যাস্টি ফ্যামিলিতে বিয়ে করেছিল। ছি……
রুপন্তি বরাবরের মতো বাকরুদ্ধ। শব্দভান্ডারে যা ছিল, সব পালিয়েছে তুহিনের অতর্কিত আক্রমণে। চোখ টলমল করছে নোনাপানিতে। যে কোনো মুহূর্তে উপচে পড়বে। তুহিনের সামনে চোখের পানি ফেললে আবার নতুন অপমান শুরু হবে। তাই নিজেকে সামলে রাখতে চেষ্টা করল। বিধি বাম! চোখের পানি কিছুতেই বাঁধ মানল না। টপাটপ পড়তে লাগল। মাথা নিচু করার আগেই দেখে ফেলল তুহিন। বলল,
– এত কান্না আসে কোত্থেকে? মাই গড! এই কদিনে তোমাকে যত কাঁদতে দেখেছি, ততটা সারাজীবনেও কাউকে দেখিনি। কান্নাকাটি করে সিম্প্যাথি চাওয়াকে আমি ঘৃণা করি। আর আমার কপালেই কি না ছিচকাঁদুনে বউ জুটেছে! এমন কিছু বলিনি, যেটা শুনে ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদতে হবে। স্টপ দিজ ফাকিং নুইসেন্স!
দু’হাতে চোখ মুছল রুপন্তি। চোখের পানি বাঁধ মানছে না। কান্নার বেগ বাড়ছে। দৌড়ে শোবার ঘরে চলে যেতে পারলে ভালো হতো। তা সম্ভব নয়। তুহিনের অনুমতি ছাড়া এক পা এদিক-ওদিক করা যাবে না। পরিস্কারভাবে বলেই দিল, টাকা দিয়ে কিনেছে। এজন্য তার কথায় উঠতে-বসতে হবে, তার ইচ্ছেয় চলতে হবে। দাসী আর নিজের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পাচ্ছে না। এখনকার সমাজে টাকা দিয়ে দাসী কেনাবেচার প্রথা নেই বিধায় বিয়ে করেছে তুহিন। নয়তো সরাসরি টাকার লেনদেন করত। এই মানুষকে কি না সে রুপকথার রাজকুমার ভাবে! তুহিন বলল,
– তোমার যদি এই বিয়ে নিয়ে আপত্তি থাকে, তাহলে ধরে নাও এটা কোনো বিয়ে না, একটা ডিল মাত্র। আমি অফার দিয়েছিলাম। তুমি অ্যাকসেপ্ট করেছ। ডিল অনুযায়ী তোমাদের পেছনে ইনভেস্ট করেছি। অ্যান্ড নাউ আই ওয়ান্ট মাই রিটার্ন। এখন থেকে আমার কথার বাইরে টু শব্দ করবে না তুমি। যখন যা বলব, মানবে। এটাকে সওদাবাজি বলো বা বিয়ে, দ্যাটস আপ টু ইউ।
বিস্ময়ের চরমে পৌঁছে গেছে রুপন্তি। স্বপ্নের রাজকুমারের এই জঘন্য রুপ কল্পনাতীত ছিল। মানুষ মাত্রই দোষেগুণে একজন। তুহিনও ব্যতিক্রম নয়। তাই বলে এত খারাপ, ভুল করেও ভাবেনি। দেখতে যত না সুর্দশন, মনটা তার চেয়ে বেশি কালো। এই মানুষ কী করে জাহিনের ভাই হয়? মৃদু স্বরে বলল,
– বিয়েটা আপনার লাইফে তুচ্ছ হলেও আমার জন্য ইম্পরট্যান্ট। আপনি হয়তো আমাকে বউ মনে করেন না, কিন্তু আমি আপনাকে মনেপ্রাণে হাজব্যান্ড মানি। এখানে সওদাবাজির কিছু নেই।
– গুড। ইন দ্যাট কেস, লো-ক্লাস মেন্টালিটি ঝেড়ে হাজব্যান্ডের লেভেলে মানিয়ে চলা উচিত তোমার। যত তাড়াতাড়ি মেন্টালিটি চেঞ্জ করতে পারবে, ততই বেটার।
– জি।
– ক্যান ইউ রিপ্লেস জি উইথ ওকে?
– ওকে।
– থ্যাংক ইউ, সুইটহার্ট। ড্রেসটা ভালোভাবেই ফিট হয়েছে। তবে ওড়না বাদ।
– এটা বাসায় পরি। গাউনের সাথে ম্যাচিং ওড়না আছে……
– উহু, ওড়না পরার দরকার নেই। শুধু ড্রেসটা পরবে।
– বুঝতে চেষ্টা করুন। এতগুলো মানুষের সামনে এই ড্রেস কীভাবে পরব? সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে।
– তাকিয়ে থাকবে বলেই তো পার্টি হচ্ছে! আমার বউকে সবাই দেখবে না?
– হ্যাঁ দেখবে। কিন্তু সবাই মানে…
– রুপন্তি।
– জি।
– আবার জি?
– স্যরি।
– একটা ব্যাপার কেন মাথায় ঢোকাতে পারছ না? তুমি এখন মিসেস ইফতেখার।
রুপন্তি চুপ করে রইল। তুহিন হতাশ ভঙ্গিতে বলল,
– আর কীভাবে বুঝাব, জানি না। বুঝানোর সময় বা ইচ্ছে কোনোটাই নেই। কাল এই ড্রেস পরে পার্টি অ্যাটেন্ড করবে, দ্যাটস ফাইনাল। হাই হিল পরবে। তোমার পায়ের মাপ জানি না বলে আগেভাগে ম্যাচিং হিল অর্ডার করতে পারিনি।
– হিল? কিন্তু আমি তো কখনো হাই হিল পরিনি।
তুহিন কড়া দৃষ্টিতে তাকাতেই রুপন্তি দ্রুত বলে উঠল,
– বলছিলাম, হিল পরে অভ্যেস নেই। তাই একটু অসুবিধে হবে। তবে আমি চেষ্টা করব।
– গুড। পারলারে সাজবে। হেয়ার স্টাইলও পারলার থেকে করে আসবে।
– জি, মানে ওকে।
– আমার টাকা সেভ করার দরকার নেই। নিজেকে সাজাতে যত টাকা লাগে, চোখ বন্ধ করে খরচ করবে।
– ওকে।
– ঘন্টাখানেক পর বের হব। হিল জুতো কিনব। আর কিছু কেনার থাকলে লিস্ট করে ফেল।
– ওকে।
– তুর্যকে নেবে না। চারুর কাছে থাকবে সে।
– ওকে।
– সুইটহার্ট, তোমার রোবোটিক ওকে ওকে শুনে এখন আমার জ্ঞান হারানো বাকি। (চলবে)
বিঃদ্রঃ পাঠকরা আগে থেকেই জেনে রাখুন এই গল্পটা পুরোটা দেয়া হবে না। বুক প্রমোশন হিসেবে কিছু পর্ব পোস্ট করা হবে। যারা প্রি অর্ডার করতে চান, তারা নাম-ঠিকানা আর মোবাইল নাম্বার আমাকে ইনবক্স করুন। ক্যাশ অন ডেলিভারি হবে। ৪৩০ পৃষ্ঠা বইয়ের মুদ্রিত মুল্য ৬৪০ টাকা। ২০%-৩০% ডিস্কাউন্টে কুরিয়ার চার্জ সহ প্রি-অর্ডার মুল্য ৫০০ থেকে ৫৬৫ টাকার মতো পড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
© সাগরিকা প্রকাশনী ও বই বিপণি । সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত